নমস্তে, আমরা কম বেশী সকলেই জানি ভারতবর্ষে স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতীর আগমনের পূর্বে শূদ্রদের বেদপাঠে নিষেধ ছিল। স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতী শূদ্রদের বেদপাঠ করাতে অতি উৎসাহী ছিলেন। আসলেই কি সেটা সত্য? চলুন আজকে এই বিষয়ে জানা যাক। (dayananda double standard)
(১)
ব্রাহ্মণস্ত্রয়াণাং বর্ণানামুপনয়নং কর্ত মর্হতি, রাজন্যোদ্বয়সস্থ্য বৈশ্যো বৈশ্যশ্যেবেতি।
শূদ্রমপি কুলগুণসম্পন্নং মন্ত্রবর্জ্যমনুপনীতমধ্যাপয়েদিত্যেকে ॥
ইহা সুশ্রুত সংহিতার সূত্রস্থানের দ্বিতীয় অধ্যায়ের বচন। ব্রাহ্মণ তিন বর্ণের অর্থাৎ ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, এবং বৈশ্যের; ক্ষত্রিয় ক্ষত্রিয়, এবং বৈশ্যের; বৈশ্য কেবল বৈশ্যের যজ্ঞোপবীত দিয়া অধ্যাপনা করিতে পারে। শূদ্র বদি কুলীন এবং শুভলক্ষণযুক্ত হয় তবে উহাকে মন্ত্রসংহিতা পরিত্যাগ করিয়া অন্য বিষয়ে পাঠপ্রদান করিবে। উহার উপনয়ন দিবে না, ইহা অনেক আচার্য্যের মত। পরে পঞ্চম অথবা অষ্টম ধর্ষবয়সে বালককে বালকদিগের, এবং কন্যাকে কন্যাদিগের পাঠশালায় প্রেরণ করিবে। নিম্নলিখিত নিয়মানুসারে অধ্যয়ন আরম্ভ করিবে। (স্রোত: সত্যার্থ প্রকাশ(২য় সংস্করণ),পৃষ্ঠা ২৮)
অনুশীলন(১)
উপরোক্ত বাক্যটি সুশ্রুত সংহিতার সূত্রস্থানের বচন। এখানে স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতী শূদ্রের উপনয়ন না দেওয়াকে সমর্থন করেছেন এবং মন্ত্রভাগ পরিত্যাগ করিয়া অন্য বিষয়ে পাঠদানের কথা বলেছেন। যদি আমরা “বেদ সংজ্ঞা” বিষয়ে আর্য সমাজের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি তাহলে শূদ্র থাকা অবস্থায় কেউ বেদ পাঠ করিতে পারিবে না কেন না আর্য সমাজ কেবল মন্ত্রভাগকেই বেদ মনে করে।
(২)
প্রশ্নঃ স্ত্রী এবং শূদ্রও কি বেদপাঠ করিবে? ইহারা বেদপাঠ করিলে আমরা কি করিব? ইহাদিগের পাঠের জন্য শাস্ত্রে প্রমাণও নাই; বরং এই নিষেধ আছে:-“স্ত্রীশূদ্রৌ নাধীয়াতামিতি শ্রুতেঃ” ॥স্ত্রী এবং শূদ্র পাঠ করিবে না এই শ্রুতি আছে।
(উত্তর) সমস্ত স্ত্রী এবং পুরুষের অর্থাৎ মনুষ্য মাত্রেরই পড়িবার অধিকার আছে। তুমি কূপমণ্ডক এবং উক্ত শ্রুতি বাক্য তোমার স্বকপোলকল্পিত,উহা কোন প্রামাণিক গ্রন্থে নাই। সকল মনুষ্যের বেদাদি শাস্ত্র পড়িবার এবং শুনিবার অধিকার বিষয়ে প্রমাণ যজুর্ব্বেদের ২৬ অধ্যায়ের দ্বিতীয় মন্ত্রে আছে:-
যথেমাং বাচং কল্যাণী মাবদানি জনেভ্যঃ।
ব্রহ্ম রাজদ্যাভ্যাৎ শূদ্রায় চার্য্যায় চ স্বায় চারণায়। যজুর্বেদ ২৬। ২॥
পরমেশ্বরের উক্তি এই যে, (যথা) যেমন আমি (জনেভ্যঃ) সকল মনুষ্যের জন্য(ইমাম্) এই (কল্যাণীং) কল্যাণকারিণী অর্থাৎ সংসার এবং মুক্তির সুখদায়িনী (বাচম্) ঋগ্বেদাদি চারি বেদের বাণী (আ, বদানি) উপদেশ দিতেছি, তদ্রূপ তুমিও অনুষ্ঠান করিবে। যদি কেহ এক্ষণে প্রশ্ন করেন, যে এস্থলে “জন” শব্দে “দ্বিজ’কে গ্রহণ করা আবশ্যক, কারণ স্মৃত্যাদি গ্রন্থে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় এবং বৈশ্যেরই বেদপাঠের অধিকার লিখিত হইয়াছে এবং স্ত্রী শূদ্রাদির অধিকার লিখিত নাই,তাহার উত্তর:-(ব্রহ্ম-রাজন্যাভাম্) ইত্যাদি দেখিলে বুঝিতে পারিবে যে পরমেশ্বর স্বয়ং কহিতেছেন যে, “আমি ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, (অর্য্যায়) বৈশ্য, (শূদ্রায়) শূদ্র, (স্বায়) নিজ ভৃত্য ও স্ত্রীলোক এবং (চ অরণায়) অতিশূদ্রদিগের জন্যও বেদের প্রকাশ করিয়াছি”। অর্থাৎ সকল মনুষ্য বেদ পাঠ এবং বেদ শ্রবণ করিয়া বিজ্ঞান বৃদ্ধি করতঃ, সৎকথার গ্রহণ এবং অসৎকথার পরিত্যাগ করিয়া দুঃখ হইতে নিঃসৃত হইয়া সুখলাভ করিবে।
দ্রষ্টব্য সত্যার্থ প্রকাশ(২য় সংস্করণ),পৃষ্ঠা (৫১-৫২)
অনুশীলন(২)
” সত্যার্থ প্রকাশ”-এ স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতী বলেছেন বেদ সকলের জন্য। স্ত্রী এবং শূদ্ররা বেদ পড়তে পারবে না এটা কোন শাস্ত্রে নেই। অথচ একই বইয়ের তৃতীয় সমুল্লাসে তিনিই সুশ্রুত সংহিতার উল্লেখ করে শূদ্রকে মন্ত্রভাগ পরিত্যাগ করিয়া অন্যান্য শাস্ত্র পড়ানোর কথা বলেছেন। যা একদম সঠিক,দেখুন–
সুশ্রুত সংহিতা,সূত্রস্থান(২/৩)
➡️সুশ্রুত সংহিতা কি প্রামাণিক গ্রন্থ নয়?এই বিষয়ে স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতীর মত দেখুন–
“এইরূপ সমস্ত বেদ পাঠ করিয়া, আয়ুর্ব্বেদ অর্থাৎ চরক, সুশ্রুত, প্রভৃতি ঋষি প্রণীত বৈদ্যক শাস্ত্র সফল উহাদিগের অর্থ, ক্রিয়া, শস্ত্র, ছেদন, ভেদন, লেপ, চিকিৎসা, নিদান, ঔষধ, পণ্য, শারীর দেশ, কাল, এবং বস্তু-গুণ উত্তমরূপে বুঝিয়া চারি বৎসরের মধ্যে পড়িয়া লইবে এবং পড়াইবে। ” (দ্রষ্টব্য : সত্যার্থ প্রকাশ(২য় সংস্করণ),৩য় সমুল্লাস,পৃষ্ঠাঃ৪৮)
স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতী নিজেই সুশ্রুত সংহিতাকে বৈদিক শাস্ত্র মেনেছেন। সুশ্রুত সংহিতা যেহেতু প্রামাণিক সেহেতু তাঁহার প্রামাণিকতার উপর নির্ভর করে স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতীর বাক্যে স্ববিরোধ ফুটে উঠে।
(৩)
যদিও কোন কোন স্থলে নিষেধ আছে, উহার অভিপ্রায় এই যে, পাঠ ও পাঠন দ্বারা যাহার কিছুই হয় না, সে নির্বুদ্ধি এবং মূর্খ বলিয়া, তাহাকে শূদ্র কহা যায়। (দ্রষ্টব্যঃসত্যার্থ প্রকাশ(২য় সংস্করণ),পৃষ্ঠা ৫২)
অনুশীলন(৩)
সত্যার্থ প্রকাশ(২য় সংস্করণ),পৃষ্ঠাঃ৫৩-তে পাওয়া যায় “বেদাদিশাস্ত্র বিদ্যা ব্যতিরেকে, ঈশ্বর এবং ধৰ্ম্মজ্ঞান হয় না, এবং অধৰ্ম্ম হইতে রক্ষা হয় না”। কিন্তু ৫২ পৃষ্ঠায় বলেছেন “পাঠ ও পাঠন দ্বারা যাহার কিছুই হয় না, সে নির্বুদ্ধি এবং মূর্খ বলিয়া, তাহাকে শূদ্র কহা যায়”। যদি বেদাদি শাস্ত্র পাঠ দ্বারা শূদ্রের ঈশ্বরজ্ঞান বা ধর্মজ্ঞান না হয় তাহলে তার উপায় কি হবে?
হস্তিনশ্চ তুরঙ্গাশ্চ শূদ্রা ম্লেচ্ছাশ্চ গর্হিতাঃ।
সিংহা ব্যাঘ্রা বরাহাশ্চ মধ্যমা তামসী গতিঃ ॥৩॥
অনুবাদঃযে অপেক্ষাকৃত মধ্যম তমোগুণবিশিষ্ট হয় সে হস্তি, অশ্ব, শূদ্র ও ম্লেচ্ছ হয় এবং অতিনিন্দিত কৰ্ম্মকারী হইলে সিংহ, ব্যাঘ্র এবং বরাহ অর্থাৎ শুকর জন্ম প্রাপ্ত হয়।
দ্রষ্টব্যঃসত্যার্থ প্রকাশ(২য় সংস্করণ),৯ম সমুল্লাস,পৃষ্ঠাঃ১৯৭
অনুশীলন(৪)
উপরোক্ত শ্লোকটি মনুস্মৃতি(১২/৪৩) এ পাওয়া যায়,স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতী এই শ্লোকটি প্রমাণ হিসেবে “সত্যার্থ প্রকাশ” এ ব্যবহার করেছিলেন। ড. সুরেন্দ্রকুমারজী উনার বিশুদ্ধ মনুস্মৃতিতে এই শ্লোককে প্রক্ষীপ্ত মানেন নি,তাই আর্য সমাজীদের নিকট এই শ্লোক সঠিক। উল্লেখিত শ্লোকে বলা হয়েছে,”যে অপেক্ষাকৃত মধ্যম তমোগুণবিশিষ্ট হয় সে শূদ্র জন্ম প্রাপ্ত হয়।
➡️মধ্যম তমোগুণবিশিষ্ট ব্যক্তির কি বেদপাঠ করার অধিকার আছে?
(৫)
(প্রশ্ন) দ্বিজ কি স্বহস্তে পাক করিয়া ভোজন করিবে অথবা শূদ্রের হস্তে পাক করাইয়া ভোজন করিবে?
(উত্তর) শূদ্রের হস্তে পাক করাইয়াই ভোজন করিবে; কারণ ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় এবং বৈশ্য বর্ণস্থ স্ত্রী এবং পুরুষ বিদ্যাপাঠে, রাজ্য পালন, এবং পশু পালন, ক্ষেত্রকাৰ্য্য ও ব্যবসায়াদি কার্য্যে তৎপর থাকিবে। শূদ্রের পাত্রে এবং উহার গৃহে পক্ক অন্ন আপৎকাল বাতিরেকে ভোজন করিবে না।
দ্রষ্টব্যঃসত্যার্থ প্রকাশ(২য় সংস্করণ),১০ম সমুল্লাস,পৃষ্ঠাঃ২০৫
অনুশীলন(৫)
উপরোক্ত বাক্যে উল্লেখিত আছে ” শূদ্রের হস্তে পাক করাইয়াই ভোজন করিবে; কারণ ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় এবং বৈশ্য বর্ণস্থ স্ত্রী এবং পুরুষ বিদ্যাপাঠে, রাজ্য পালন, এবং পশু পালন, ক্ষেত্রকাৰ্য্য ও ব্যবসায়াদি কার্য্যে তৎপর থাকিবে। “
ইহা দ্বারা বোঝা যায় ব্রাহ্মণ,ক্ষত্রিয় এবং বৈশ্য বিদ্যাপাঠ,রাজ্যপালন এবং পশু পালন, ক্ষেত্রকার্য্য ও ব্যবসায়াদি করলেও শূদ্রকে বিদ্যাপাঠ করার অধিকার দেওয়া হয় নাই।
✋যজুর্বেদ(২৬/২) এর ভাষ্যে স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতী সকল মনুষ্যের বেদপাঠ এবং শ্রবণে অধিকার আছে এমন বিষয়ই তুলে ধরেছেন। স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতীর শুক্লযজুর্বেদ(২৬/২) নিয়ে একটু আলোচনা করা দরকার।
উক্ত মন্ত্রে স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতী “স্বায়” পদের অর্থ করেছেন “নিজের স্ত্রী সেবকাদি”!
দ্রষ্টব্যঃযজুর্বেদ(২৬/২) মন্ত্রের পদার্থ
প্রশ্নঃপরমব্রহ্মেরও কি স্ত্রী হয়?
আরও দেখুন–
(মে) আমার (অয়ম্) এই (কাম) কামনা (সমৃধ্যতাম্) উত্তমতা পূর্বক বৃদ্ধি হউক তথা (মা) আমাকে (অদঃ) সেই পরোক্ষ সুখ (উপ, নমতু) প্রাপ্ত হউক সেইরূপ আপনারাও হইবেন এবং সেই কামনা তথা সুখ আপনিও প্রাপ্ত হউন।
➡️আমার এই কামনা উত্তমতা পূর্বক বৃদ্ধি হউক তথা আমাকে সেই পরোক্ষ সুখ প্রাপ্ত হউক সেইরূপ আপনারাও হইবেন এবং সেই কামনা তথা সুখ আপনিও প্রাপ্ত হউন।
প্রশ্নঃপরমব্রহ্মেরও কি কামনা আছে?কামনা উৎপন্ন হয় অভাব বা অপূর্ণতা থেকে। সচ্চিদানন্দ ব্রহ্মের আবার পরোক্ষ সুখ প্রাপ্ত হবে এটাও কি মানা যায়?
👉যেখানে স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতী এবং আর্য সমাজ পরমব্রহ্মকে কেবল নিরাকার এবং সচ্চিদানন্দ মনে করেন। সেখানে ঈশ্বরের স্ত্রী এবং কামনা কল্পনা করা মূর্খতার সমান।
🤔শূদ্র বিষয়ে স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতীর বেদভাষ্যে যা পাওয়া যায়–
(উক্ষা) সিঞ্চনকারী বৃষভ তুল্য শূদ্র তুমি…। শুক্লযজুর্বেদ(১৪/৯)
(শূদ্রঃ) মূর্খতাদি গুণযুক্ত শূদ্র। শুক্লযজুর্বেদ(৩১/১১)
বিচারঃ
উপরোক্ত প্রমাণাদি হতে এটি স্পষ্ট হয় যে শূদ্রের বেদপাঠ বিষয়ে স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতীর স্ববিরোধীতা এবং দ্বিচারিতা বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয়!
✅বিশেষ দ্রষ্টব্যঃদুর্জন বিদ্বান হলেও পরিত্যাজ্য!
লেখক : সত্য সন্ধানী
বিশেষ দ্রষ্টব্য: এই লেখার বিরুদ্ধে যাবতীয় আইনি প্রক্রিয়া মহামান্য কলকাতা উচ্চ ন্যায়ালয়ের (Calcutta High Court) অধীনে পড়ছে।
আরও পড়ুন :


