‘ধর্মার্থকামমোক্ষাখ্যং পুরুষার্থচতুষ্টয়ম্’ — ধর্ম, অর্থ, কাম ও মোক্ষ হল পুরুষার্থচতুষ্টয় (Purushartha Chatushtaya)।
পুরুষার্থ শব্দে সন্নিহিত ‘অর্থ’-এর অর্থ হল প্রয়োজন। ধর্ম, অর্থ, কাম এবং মোক্ষ সংজ্ঞক পুরুষার্থচতুষ্টয়ের অন্তর্গত অর্থের অর্থ ভোগ্যসামগ্রী। শ্রীসূক্তানুসারে পৃথিবী, জল, প্রকাশ, পবন ও আকাশের সাথে পাঞ্চভৌতিক বাহ্যপ্রপঞ্চ এবং দেহেন্দ্রিয়প্রাণান্তঃকরণের সঙ্গে পরম-অর্থ-পরমাত্মার অভিব্যক্তি ও তাঁর প্রতি প্রযুক্ত ও নিযুক্ত জগৎ ও জীবনের নাম অর্থ। তদ্বৎ প্রয়োজন ও পূরণের নামও অর্থ, উদাহরণার্থ অন্ন অর্থ। অন্নের সেবন দ্বারা প্রাপ্ত ক্ষুধার নিবৃত্তি, দেহেন্দ্রিয়প্রাণান্তঃকরণের পুষ্টি তথা তৃপ্তিসংজ্ঞক আহ্লাদ হল কাম। অতঃ সর্ববিধ অনর্থের থেকে বিমুক্ত ভোগ্যসামগ্রীর উপভোগ দ্বারা প্রাপ্ত সুখের নামই কাম। অর্থোপার্জন ও বিষয়োপভোগের বেদাদিশাস্ত্রসম্মত যে সুস্থবিধি লৌকিক ও পারলৌকিক উভয়রূপ উৎকর্ষ তথা পরমাত্মার প্রাপ্তিতে প্রযুক্ত ও নিযুক্ত হয় সেটিই ধর্ম। আত্মা অদ্বিতীয়-সচ্চিদানন্দ স্বরূপ, তার বিজ্ঞানের অমোঘ প্রভাবে জন্মমৃত্যুর অনাদি-অজস্র পরম্পরার আত্যন্তিক উচ্ছেদ, অর্থাৎ মৃত্যু, জড়তা তথা দুঃখ থেকে অতিক্রান্ত আত্মানুরূপ আত্মস্থিতি হল মোক্ষ (Purushartha Chatushtaya)।

শ্রীমদ্ভাগবতের একাদশ স্কন্ধের ত্রয়বিংশতি অধ্যায়ের অষ্টাদশ ও ঊনবিংশতি শ্লোকানুসারে – পঞ্চদশ অনর্থের থেকে বিমুক্ত অর্থই পুরুষার্থসংজ্ঞক। চুরি, হিংসা, মিথ্যা, দম্ভ, কাম, ক্রোধ, গর্ব, অহংকার, ভেদ, শত্রুতা, অবিশ্বাস, স্পর্ধা, লম্পটতা, দ্যূত ও মদ্যরূপী পঞ্চদশ অনর্থের থেকে অর্থকে বিমুক্ত রাখা পরমাবশ্যক।
তদ্বৎ ‘কাম’কে পুরুষার্থহীনতা থেকে রক্ষার্থে – দেশাতিক্রম, কালাতিক্রম, পাত্রাতিক্রম, অপবিত্রতা, মতভেদ, অসংযম, নিন্দা, বাচালতা, অশ্লীলতা, মদবিহ্বলতা, অভক্ষ্যভক্ষণ, অতিসন্নিকটতা, অতিদূরতা, অস্নিগ্ধতা ও অনুদারতারূপী পঞ্চদশ বিকার থেকে কামকে বিমুক্ত রাখা পরমাবশ্যক।
তদ্বৎ ‘ধর্ম’কে পুরুষার্থহীনতা থেকে রক্ষার্থে – অনধিকারচেষ্টা, দেশাতিক্রম, কালাতিক্রম, পাত্রাতিক্রম, দম্ভ, দ্রোহ, অভিমান, খ্যাতি, অসংযম, মিথ্যা আহার-বিহার, দেবতা-পিতৃ-পরলোক-পরমেশ্বর-পরোপকার-পূর্বজন্ম-পুনর্জন্মে অনাস্থা, পরোৎকর্ষের অসহিষ্ণুতা, আলস্য, অসত্য ও অধৈর্যরূপী পঞ্চদশ বিকার থেকে ধর্মকে বিমুক্ত রাখা পরমাবশ্যক।
তদ্বৎ ‘মোক্ষ’কে পুরুষার্থহীনতা থেকে রক্ষার্থে – পুত্রৈষণা, বিত্তৈষণা, লোকৈষণা, মলসহিষ্ণুতা, বিক্ষেপসহিষ্ণুতা, অজ্ঞানকৃত আবরণসহিষ্ণুতা, প্রমাদ, অহংকার, হরি-গুরু বিমুখতা, দ্বৈতসহিষ্ণুতা, শ্রবণ-মনন-নিদিধ্যাসনে পরাঙ্মুখতা, নির্গুণ-নির্বিশেষের অস্তিত্বে অনাস্থা, পরমেশ্বরের পরোক্ষতা, আত্মার পরিচ্ছিন্নতা তথা আত্মার অসচ্চিদানন্দরূপতার মান্যতারূপী পঞ্চদশ বিকারের পরিত্যাগ পরমাবশ্যক।
আরও পড়ুন : vedadi shastra parichay অপৌরুষেয় বেদ ও হিন্দুশাস্ত্র পরিচয়

