vedadi shastra parichay সনাতন হিন্দুধর্মের প্রধান ধর্মগ্রন্থ হল বেদ। বেদ অপৌরুষেয়, অর্থাৎ কোনো ব্যক্তি কর্তৃক এর রচনা হয়নি। ঈশ্বরও বেদের রচনা করেননি। যজুর্বেদ বলছে ঈশ্বরের নিঃশ্বাস থেকে বেদ নির্গত হয়েছে (যজুর্বেদ বৃহদারণ্যক উপনিষদ ২।৪।১০)। যেমন নিঃশ্বাস আমাদের কোনো প্রযত্ন ছাড়াই চলতে থাকে, তেমনই ঈশ্বরের কোনো প্রযত্ন ছাড়াই বেদ প্রকাশিত। ঈশ্বর প্রতি কল্পে পূর্ব কল্পের অনুরূপ বেদ প্রকাশ করে থাকেন। তিনি সবার আগে ব্রহ্মাকে উৎপন্ন করেন, ও তাঁকে বেদ প্রদান করেন (যজুর্বেদ শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ ৬।১৮)। বেদ অপৌরুষেয় হওয়ায় পুরুষকর্তৃক রচনার কোনো ত্রুটি এতে পাওয়া সম্ভব নয়, এটা মীমাংসক আচার্যদের অভিমত। বেদ ঈশ্বর কর্তৃক রচিত হলে তা অনাদি হয় না, কারণ রচনার বা নির্মাণের আগে কোনো কিছুর অস্তিত্ব থাকে না। যেমন কোনো ভবন নির্মাণের আগে সেই ভবন ছিল না, থাকলে কীভাবে নির্মিত হল, তেমনই বেদের নির্মাণ হয়ে থাকলে তা অনাদি হয় না (vedadi shastra parichay)।
বেদ কী বলার পরে এবারে বেদের উপাদান সম্পর্কে বলছি। মন্ত্র ও ব্রাহ্মণ মিলিয়েই বেদ (মন্ত্রব্রাহ্মণয়োর্বেদনামধেয়ম্, আপস্তম্ব শ্রৌতসূত্র ২৪।১।৩১)। যজ্ঞে যা পড়া হয়, যা জপ করা হয়, এগুলো হল মন্ত্র। মন্ত্র ছাড়া বাকি বেদ হল ব্রাহ্মণ। আরণ্যক ও উপনিষদ মূলতঃ বেদের ব্রাহ্মণভাগের অংশ, কিছু ক্ষেত্রে তা মন্ত্রভাগেও থাকে। মন্ত্রব্যতিরিক্ত ব্রাহ্মণের ভাগগুলো এরকম – বিধি, নিষেধ, নামধেয় ও অর্থবাদ (মীমাংসা পরিভাষা)। বেদের মোট ১১৩১টা শাখা ছিল; ঋগ্বেদের ২১টা, সামবেদের ১০০০টা, যজুর্বেদের ১০১টা ও অথর্ববেদের ৯টা শাখা (মহাভাষ্য, পষ্পশাহ্নিক)। শ্রুতি, নিগম, ছন্দ এসব বেদের প্রতিশব্দ। বেদের ব্রাহ্মণভাগে বিধি, নিষেধ, অর্থবাদ এই বিষয়গুলো থাকে। যজ্ঞে কর্তব্য, অকর্তব্য অর্থাৎ কী করবেন, কী করবেন না এই সব ব্রাহ্মণভাগের আলোচ্য বিষয়। আরণ্যকভাগ বনে পঠনীয় আর উপনিষদে ব্রহ্মতত্ত্ব আলোচিত হয়েছে। প্রামাণিক উপনিষদ মোট ১০৮টা, যার তালিকা মুক্তিকোপনিষদে পাওয়া যায়(vedadi shastra parichay)।

রামমোহন রায় অভিমত প্রকাশ করেছেন যে যবন ও জৈনদের আক্রমণে বেদের বহু শাখা লুপ্ত হয়েছে। (ব্রহ্মনিষ্ঠ গৃহস্থের লক্ষণ, রামমোহন রচনাবলী)। ১১৩১টা শাখার মধ্যে আজ মাত্র ১৩টা মতন শাখা পাওয়া যায়।
ঋগ্বেদের শাকল, বাষ্কল, আশ্বলায়ন; সামবেদের কৌথুম, রাণায়নীয়, জৈমিনীয়; যজুর্বেদের মাধ্যন্দিন, কাণ্ব, কঠ, তৈত্তিরীয়, মৈত্রায়ণী, কপিস্থল-কঠ আর অথর্ববেদের শৌনক, পৈপ্পলাদ প্রমুখ শাখা পাওয়া যায়।
একই গাছের বিভিন্ন শাখা বা ডাল যেমন গাছ থেকে আলাদা কিছু নয়, তেমনই শাখা বেদ থেকে আলাদা কিছু নয়। প্রতি দ্বাপরযুগে ব্যাসদেব বেদকে চারভাগে বিভক্ত করেন ও নিজের চার শিষ্যকে এক এক বেদ শিক্ষা দেন (বিষ্ণুপুরাণ)। সেই শিষ্যরা আবার শিষ্যক্রমে বেদের এক এক অংশ শিক্ষা দিয়ে থাকেন। এইভাবেই যিনি বেদের যে যে অংশ পড়িয়েছেন, তাঁর নামে সেই শাখার নামকরণ করা হয়েছে। সব শাখাই অপৌরুষেয়।
অনেক অনার্ষ ব্যক্তি বলে থাকেন যে বেদের থেকে শাখা আলাদা, চার বেদের মাত্র চার সংহিতাই প্রামাণিক, শাখা ও ব্রাহ্মণগ্রন্থগুলো ঋষিদের লেখা বেদের ব্যাখ্যা; কিন্তু এই অভিমত একদমই সঠিক নয়। বেদাঙ্গে আজকে পাওয়া যায় ও পাওয়া যায় না, এরকম সব শাখা থেকেই বেদমন্ত্র উল্লেখিত হয়েছে। এবিষয়ে নিরুক্তের এক বচন দেখা যাক, যস্মাৎপরং নাপরমস্তি…ইত্যপি নিগমো ভবতি।(নিরুক্ত ২।৩)। এটাকে নিগম অর্থাৎ বেদমন্ত্র বলেই উল্লেখ করা হয়েছে। এই বাক্যটা শ্বেতাশ্বতর উপনিষদে (৩।৯) পাওয়া যায়। অর্থাৎ নিরুক্তের প্রমাণ অনুসারে ব্রাহ্মণ, আরণ্যক, উপনিষদ সবই বেদের অংশ বলেই স্বীকৃত। বেদের সর্বশ্রেষ্ঠ ভাষ্যকার হলেন শ্রীমৎ সায়ণাচার্য। তিনি দক্ষিণ ভারতের বিজয়নগর সাম্রাজ্যের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। রাজ্য সামলানোর সঙ্গে সঙ্গে তিনি বৈদিক জ্ঞানের মহান পণ্ডিতও ছিলেন। রাজা দ্বিতীয় হরিহর রায় তাঁকে বেদের ভাষ্য লেখার দায়িত্ব দেন। তিনি একার হাতে চার বেদের উপলব্ধ মন্ত্রভাগ ও ব্রাহ্মণভাগের সংস্কৃত ভাষ্য রচনা করেন। আজ পর্যন্ত এই কৃতিত্ব আর কারোরই নেই। সায়ণভাষ্য ছাড়া বেদের সঠিক অর্থ বোঝা অসম্ভব। এছাড়াও শ্রীমৎ উবটাচার্য ও শ্রীমন্মহীধরাচার্যও যজুর্বেদের মাধ্যন্দিন সংহিতার ভাষ্য রচনা করেছেন(vedadi shastra parichay)।
হিন্দুধর্মের অন্যান্য শাস্ত্র (vedadi shastra parichay)
বেদের কথা বলার পরে এবারে হিন্দুধর্মের বাকি শাস্ত্রের কথা বলব। বেদ সহ মোট শাস্ত্র ১৮ প্রকার, একে অষ্টাদশবিদ্যাও বলা হয়। অষ্টাদশবিদ্যা এইরূপ, চার বেদ – ঋগ্বেদ, যজুর্বেদ, সামবেদ, অথর্ববেদ; ছয় বেদাঙ্গ (কল্প, ছন্দ, জ্যোতিষ, নিরুক্ত, ব্যাকরণ, শিক্ষা), চার উপাঙ্গ (পুরাণ, ন্যায়, মীমাংসা ও ধর্মশাস্ত্র) ও চার উপবেদ (আয়ুর্বেদ, ধনুর্বেদ, গান্ধর্ববেদ ও অর্থশাস্ত্র)। এবিষয়ে বিস্তারিত জানার জন্য আগ্রহী পাঠক শ্রীমন্মধুসূদন সরস্বতী কৃত প্রস্থানভেদ বইটা পড়তে পারেন(vedadi shastra parichay)।

বেদ ছাড়া বাকি শাস্ত্র বেদ বুঝতে সহায়তা করে। ছয় বেদাঙ্গের কাজ নিম্নরূপ। কল্প বৈদিক যজ্ঞের পদ্ধতি নির্দেশ করে। বেদের ব্রাহ্মণভাগে দেওয়া পদ্ধতি অনুসরণ করেই ঋষিরা কল্প প্রণয়ন করেছেন। কল্পের চার ভাগ, শ্রৌতসূত্র, গৃহ্যসূত্র, ধর্মসূত্র ও শুল্বসূত্র। শ্রৌতসূত্রে শ্রুতি অর্থাৎ বেদে দেওয়া যজ্ঞের পদ্ধতি বর্ণিত। গৃহ্যসূত্রে মানুষের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত নানা ক্রিয়াকর্মের বর্ণনা আছে। ধর্মসূত্রে সামাজিক জীবনে কী করণীয় ও কী করা উচিত নয়, তা বলা আছে। শুল্বসূত্র আজকের জ্যামিতির পূর্বসূরী। এতে বৈদিক যজ্ঞের বেদী নির্মাণের পদ্ধতি রয়েছে(vedadi shastra parichay)।
বৈদিক যজ্ঞে কল্পসূত্রের গুরুত্ব প্রচুর। বেদ ও মনুস্মৃতির পরেই কল্পের স্থান তা বলা যায়। আপস্তম্ব, বোধায়ন প্রভৃতির কল্পসূত্র, পারস্কর, খাদির, গোভিল প্রভৃতি গৃহ্যসূত্র, আপস্তম্ব ধর্মসূত্র; আপস্তম্ব, মানব, কাত্যায়ন, বোধায়ন প্রভৃতি শুল্বসূত্র প্রসিদ্ধ। ছন্দে বেদমন্ত্রের অক্ষরভিত্তিক বিভাগ আলোচিত হয়েছে। গায়ত্রী, অনুষ্টুভ্ আদি ছন্দসমূহ এতে আছে। ছন্দসূত্রের লেখক পিঙ্গলাচার্য। বেদাঙ্গ জ্যোতিষে বৈদিক যজ্ঞের সময়কাল নির্ণয় করা হয়। এরই অংশ হল আজকের ফলিত জ্যোতিষ, যাতে জাতকের জন্মসময় ও স্থান থেকে তার ফলাদেশ করা হয়(vedadi shastra parichay)।
নিরুক্তে বৈদিক শব্দ কীভাবে কোন্ ধাতু থেকে উৎপন্ন হয়েছে তা আলোচনা করা হয়। বিভিন্ন নিরুক্তকার থাকলেও আজকে শুধু যাস্কের নিরুক্তই পাওয়া যায়। ব্যাকরণে বৈদিক ও লৌকিক শব্দ নিয়ে আলোচনা করা হয়। সংস্কৃত ব্যাকরণের প্রধান গ্রন্থ হল পাণিনি মুনির অষ্টাধ্যায়ী। এর উপরে কাত্যায়নের বার্তিক ও পতঞ্জলির মহাভাষ্য প্রসিদ্ধ(vedadi shastra parichay)। এই তিনটেকে একত্রে ত্রিমুনি ব্যাকরণ বলা হয়। মহাভাষ্যে পাণিনি ব্যাকরণের সব সূত্র ব্যাখ্যাত হয়নি, এর জন্য জয়াদিত্য ও বামন কৃত কাশিকাবৃত্তি পড়তে হয়। শিক্ষা বেদাঙ্গে সংস্কৃত বর্ণমালার উচ্চারণ ব্যাখ্যাত হয়েছে। পাণিনীয় শিক্ষা সহ নানা মুনির শিক্ষা গ্রন্থ প্রসিদ্ধ। এছাড়াও বেদ বুঝতে প্রাতিশাখ্য ও শৌনক মুনি কৃত বৃহদ্দেবতা পঠনীয়। প্রাতিশাখ্যে শাখা ভিত্তিক বর্ণোচ্চারণ পদ্ধতি আলোচিত। বেদভাষ্যকার উবটাচার্য শুক্লযজুর্বেদীয় প্রাতিশাখ্যের উপরে টীকা লিখেছেন। বৃহদ্দেবতা থেকে আমরা ঋগ্বেদসংহিতার বিভিন্ন মন্ত্রের দেবতাদের নাম পাই(vedadi shastra parichay)।
এরপরে আসি বেদোপাঙ্গ পরিচয়ে। বেদোপাঙ্গ চারটে; পুরাণ, ন্যায়, মীমাংসা ও ধর্মশাস্ত্র। পুরাণের মধ্যে ইতিহাস ও অষ্টাদশ মহাপুরাণ, উপপুরাণ প্রভৃতি গৃহীত। ইতিহাস অর্থাৎ রামায়ণ ও মহাভারত। অষ্টাদশ মহাপুরাণ হল অগ্নি, শিব, মৎস্য, মার্কণ্ডেয়, ব্রহ্ম, ব্রহ্মাণ্ড, ব্রহ্মবৈবর্ত, ভাগবত, ভবিষ্য, বিষ্ণু, বামন, বরাহ, নারদ, লিঙ্গ, কূর্ম, স্কন্দ, গরুড়, পদ্ম এইগুলো। ন্যায় অর্থাৎ ন্যায় ও বৈশেষিক দর্শন। মীমাংসা অর্থাৎ পূর্ব ও উত্তর মীমাংসা বা বেদান্তদর্শন। ধর্মশাস্ত্র অর্থাৎ মনুস্মৃতি, যাজ্ঞবল্ক্যস্মৃতি, পরাশরস্মৃতি, বিষ্ণুস্মৃতি, ব্যাসস্মৃতি এসব(vedadi shastra parichay)।
চার উপবেদ হল আয়ুর্বেদ, ধনুর্বেদ, গান্ধর্ববেদ ও অর্থশাস্ত্র। আয়ুর্বেদে সুস্থতার উপায় ও রোগ হলে তার চিকিৎসাপদ্ধতি আলোচিত হয়েছে। ধনুর্বেদে ধনুক সহ নানা অস্ত্রনির্মাণ বলা হয়েছে। গান্ধর্ববেদে সঙ্গীত সংক্রান্ত বিষয় আলোচিত হয়েছে আর অর্থশাস্ত্রে রাজ্যশাসনপদ্ধতি আলোচিত হয়েছে। এই নিয়েই সনাতন হিন্দুধর্মের মহাসাগরসদৃশ বিশাল শাস্ত্রসমূহের অতি সংক্ষিপ্ত পরিচয়। শাস্ত্র অধ্যয়নের আগে সংস্কৃত ভাষার জ্ঞান অবশ্যপ্রয়োজনীয়। তার জন্য আজকের দিনে আন্তর্জালীয় মাধ্যমে সংস্কৃত শেখার অনেক সুযোগ রয়েছে। তা ব্যবহার করতে সবাইকে অনুরোধ করি। সংস্কৃতভাষা শেখা আমাদের অবশ্যকর্তব্য। তার পরে শাস্ত্র অধ্যয়ন করা উচিত(vedadi shastra parichay)।
শৌনক রায়চৌধুরী
(শৈলসুতা পত্রিকার শারদীয়া ১৪৩২ সংখ্যায় প্রকাশিত)
আরও পড়ুন : আমাদের “ধর্ম সনাতন” শাস্ত্রে নাকি উল্লিখিত নেই! এমন দাবির সত্যতা যাচাই ও আক্ষেপ খণ্ডন।
কিনতে পারেন : চৌখাম্বা প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত ঈশোপনিষদ

